নেত্রকোনার নুরজাহান অভাবের কাছে হেরে যাননি

নেত্রকোনার নুরজাহান খানম দরিদ্র একটি পরিবারে বড় হয়েছেন। কিন্তু নুরজাহান তাঁর বাবার সংসারে অভাবের কাছে হেরে গেছেন। তবে তিনি অভাবের কারণে খুব বেশি লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। নুরজাহান গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তারপর তাঁর দ্ররিদ্র বাবা তাঁকে বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ে হওয়ার পর তিনি দেখতে পান তাঁর স্বামীর সংসারের অবস্থায়ও খুব বেশি ভালো ছিল না। দিন আনা আর দিন খাওয়ার মতো অবস্থা ছিল। তিনি লেখাপড়া করতে পারেননি বলে নিজের মনের আগ্রহ কখনো হারিয়ে ফেলেননি। সংসারের এরকম পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের চার সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন।

নুরজাহান খানম ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার ২নং আশুজিয়া ইউনিয়নের সিংহেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদের স্ত্রী তিনি।

নুরজাহান খানমের তিন ছেলে আর এক মেয়ে। তাঁর বড় ছেলে আবুল কালাম আজাদ একজন চিকিৎসক। রংপুর মেডিকেল কলেজে পড়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর মেয়ে নাসরিন সমাজকর্মে ডিগ্রী পাশ করেছেন। মেজ ছেলে হুমায়ুন কবির সমাজবিজ্ঞান নিয়ে ডিগ্রী পাশ করে একটি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং ছোট ছেলে জসিম উদদ্নি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী পাশ করে একটি সরকারি চাকরি করছেন। বর্তমানে তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি দেশে পড়াশোনা করছেন।

নুরজাহান খানম তাঁর স্বামীর পরিবার নিয়ে বলেন, ১৯৭২ সালে তাঁর বিয়ে হয়, সে সময় তাঁর স্বামীর পরিবার অভাবের মধ্যে দিয়ে দিন কাটত। এছাড়াও শ্বশুরবাড়ির সংসারে ১১ জন সদস্য। বিয়ে হওয়ার ঠিক তিন বছর পর তাদের পরিবারে একটি সন্তানের জন্ম হয়। প্রথম সন্তান জন্ম হওয়ার পরেই কিছু দিনের মাথায় তাঁর স্বামী আব্দুল হামিদ এর চাকরি হয় রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

চাকরি পাওয়ার ঠিক তিন বছর পর জন্ম হয় এবং পরপর দুই বছরে দুই ছেলের জন্ম হয়। বাবা-মা আর চার সন্তান নিয়ে তাঁর স্বামীর অল্প বেতনে সংসার চালাত। চাষাবাদ করার জন্য কোন জমি না থাকায় চরম অভাবের মধ্যে দিন চলে যেত। সংসারে অভাবের কারণে টিকে থাকাটা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়ে। এরকম পস্থিতিতেও নুরজাহান অভাবের কাছে হেরে যাননি।

নেত্রকোনার নুরজাহান অভাবের কাছে হেরে যাননি

সংসারের অভাব দুর করার জন্য নুরজাহান তাঁর বাড়িতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল লালন পালন করতে শুরু করেন। বাড়ির পাশে চাষ করেন শাকসবজি। এছাড়াও চার সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য স্কুলে ভর্তি করান। সন্তানদের লেখা পড়া চালাতে সংসারে আরো অভাবে দেখা দেয়। স্বামীর অল্প বেতনে আর নিজের আয়ে কোনভাবেই সংসার চলত না। সংসারে এরকম অভাবের কাছে কোনভাবেই নিজের হাল ছাড়েননি নুরজাহান। তাঁর মেয়েদের এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপের সময় টাকা না থাকায় নিজের কানের দুল বিক্রি করে ফরম পূরণের টাকা দেন।

তার ছোট ছেলে মো: জসিম উদ্দিন গতকাল ১৩ মে (শনিবার) যুক্তরাজ্য থেকে মোবাইল ফোনে বলেন, আমরা চার ভাই বোনদের কাছে আমাদের মা বেহেশত। আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। আমরা চার ভাই বোন বর্তমানে যা হতে যাচ্ছি তা শুধু আমাদের বাবা-মার জন্যই। এছাড়াও স্কুল শিক্ষক বাবার সামান্য বেতন আর মা যেভাবে আমাদের বড় করে তুলেছেন সেটা ভাবলে এখন হয়তো অসম্ভব বলে মনে হয়।

আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মা আমাদের চার ভাই বোনদের দেশপ্রেম, সততা আর সঠিক শিক্ষাই দিয়েছেন। জীবনে আমরা যেন সৎভাবে সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে পারি।

বর্তমানে নুরজাহান ও তাঁর স্বামী আব্দুল হামিদ গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। এছাড়াও নুরজাহান সব সময় চেয়েছিলেন তাঁর চার সন্তানরা যেন পড়াশোনা করে মানুষের মত মানুষ হয়। নিজেরা না খেয়ে অনেক কষ্ট করে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছেন। তাদের পড়াশোনার কোন রকম সমস্যা যাতে না হয় সেই বিষয়েও সব সময় খেয়াল করতেন। বর্তমানের তাঁদের সন্তানরা দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করছেন, তাদের সন্তানের কৃতিত্ব তাদের জন্য অনেক আনন্দের।

সূত্র:- Right News BD

en_USEnglish